বন্ধ করুন

আমাদের স্বেচ্ছাসেবক সম্প্রদায় কাজ করে যাচ্ছে বিশ্বের কোনা থেকে না বলা গল্পগুলো আপনাদের কাছে তুলে ধরতে। তবে আপনাদের সাহায্য ছাড়া আমরা তা পারব না। আমাদের সম্পাদনা, প্রযুক্তি এবং প্রচারণা দলগুলোকে সুষ্ঠুভাবে চলতে সহায়তার জন্যে আপনারা আপনাদের দানের অংশ থেকে কিছু গ্লোবাল ভয়েসেসকে দিতে পারেন।

সাহায্য করুন

উপরের ভাষাগুলো দেখছেন? আমরা গ্লোবাল ভয়েসেস এর গল্পগুলো অনুবাদ করেছি অনেক ভাষায় যাতে বিশ্বজুড়ে মানুষ এগুলো সহজে পড়তে পারে।

আরও জানুন লিঙ্গুয়া অনুবাদ  »

যুদ্ধের শিকার ইয়েমেনের ইতিহাস ও ঐতিহ্য

 A captivating view of Old Sana'a by photographer Ameen Alghabri

প্রাচীন সানার একটি দৃষ্টিনন্দন চিত্র। ছবি তুলেছেন আমিন আলঘাবরি।

আরব বিশ্বের সবচে প্রাচীন সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দু হলো ইয়েমেন। আবার একই সঙ্গে দেশটি খুব গরীবও। গত তিন মাস ধরে সেই দেশটির উপরেই কিনা বিমান হামলা চালাচ্ছে পার্শ্ববর্তী ধনী দেশ সৌদি আরব। সৌদির সাথে যোগ দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের আরো কয়েকটি দেশ। বিমান হামলা শুরু হয় বিদ্রোহী হুতিরা রাজধানী সানা দখল করে নেয়ার পর। বিদ্রোহীরা সানা দখল করে নিলে রাষ্ট্রপতি আব্দু রাবু মানসুর হাদী বন্দর নগরী এডেনে পালিয়ে যান। সেখান থেকে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে গিয়ে আশ্রয় নেন।

২৫ মার্চ থেকে বিমান হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে ইতোমধ্যে ২,৫০০ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১১ হাজারের বেশি মানুষ। যুদ্ধের কারণে ঘরবাড়ি হারিয়েছেন ১ মিলিয়ন ইয়েমেনি। তাছাড়া দেশটির ২১.১ মিলিয়ন মানুষের (মোট জনসংখ্যার ৮০ শতাংশ) মানবিক সাহায্যের প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। আর এসব পরিসংখ্যান উঠে এসেছে জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা বিষয়ক সংস্থা ইউএনওসিএইচএ-র সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে। শুধু দেশটির মানুষজনই যুদ্ধের ভয়াবহতার শিকার হননি। দেশটির ঐতিহ্যবাহী ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোও ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে।

গত ৯ মে সৌদি যুদ্ধ বিমান সাদাহ শহরের ইমাম আল হাদি মসজিদকে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করে। এই অঞ্চলে হুতিদের শক্ত অবস্থান রয়েছে। ইয়েমেনের পুরোনো মসজিদগুলোর মধ্যে এটির অবস্থান তৃতীয়। ১২০০ বছর আগে এটি নির্মিত হয়েছিল।

সৌদি বাহিনী সাদাহ শহরের ঐতিহাসিক ইমাম আল হাদি মসজিদকে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করেছে। হুতি টেলিভিশন আলমাসিরাহ থেকে ভিডিওটি নেয়া হয়েছে।

সাদাহ প্রদেশের ইমাম আল হাদি মসজিদের ছবি। এখানে আজকে সৌদি বিমান হামলা করেছে। ৪ জন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন ১০০ জন।

মানবাধিকার কর্মী জামিলা হানান তার টুইটে প্রাচীন, সুন্দর মসজিদের ছবি শেয়ার করেছেন:

নবম শতাব্দীতে ইয়েমেনের সাদাহ’র চমৎকার আল হাদী মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল বলে প্রতিবেদন পড়ে জানতে পারলাম। বিশ্বাস করতেই কষ্ট হচ্ছে এখানে বোমা হামলা করা হয়েছে।

মে মাসের ১১ তারিখে সারারাত ধরে ইয়েমেনের রাজধানী এবং বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন শহর হিসেবে পরিচিত সানায় বোমা হামলা চালানো হয়। এতে করে অনেক ঐতিহাসিক ভবন ধ্বংস হয়। অন্য আরেকটি প্রাচীন শহর সাদাহতেও বিমান হামলায় প্রাচীন অনেক স্থাপনা ধ্বংস হয়। এদের মধ্যে প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা হিসেবে পরিচিত ইসলাম-পূর্ব যুগের প্রাচীর শহর বারাকুশও আছে। এই প্রেক্ষিতে ইউনেস্কোর মহাসচিব একটি বিবৃতি প্রদান করেন। সেখানে সব পক্ষকেই ইয়েমেনের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারগুলো রক্ষার আহ্বান জানান। মিস ইরিনা বোকোভা বলেন:

I am particularly distressed by the news concerning air strikes on heavily populated areas such as the cities of Sana’a and Saa’dah. In addition to causing terrible human suffering, these attacks are destroying Yemen’s unique cultural heritage, which is the repository of people’s identity, history and memory and an exceptional testimony to the achievements of the Islamic Civilization…I call on all parties to refrain from any military use or targeting of cultural heritage sites and monuments, in respect of their obligations under international treaties

জনবহুল সানা এবং সাদাহ’র মতো শহরে বিমান হামলার সংবাদ শুনে ব্যক্তিগতভাবে আমি খুবই পীড়িত বোধ করছি। এই বিমান হামলা মানুষের ভয়াবহ দুর্ভোগ সৃষ্টি করা ছাড়াও ইয়েমেনের অনন্য সাংস্কৃতিক সম্পদগুলোও ধ্বংস করে ফেলছে। এই সাংস্কৃতিক সম্পদগুলো ইসলামিক সভ্যতার মানুষের পরিচয়, ইতিহাস, স্মৃতি এবং ব্যতিক্রমী বিষয়গুলোর উজ্জ্বল সাক্ষ্য বহন করে… আমি সকল পক্ষকে অনুরোধ করবো আন্তজার্তিক চুক্তিসমূহের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সাংস্কৃতিক সম্পদগুলোকে সামরিক আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু না করতে।

মে মাসের ২৪ তারিখে হুদাইদা প্রদেশের বাজেল শহরের প্রাচীন আল-শারীফ দুর্গ দু’বার সৌদি বিমান হামলার শিকার হয়।

সৌদি আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু ইয়েমেনের সাংস্কৃতিক সম্পদগুলো। হুদাইদা প্রদেশের বাজেল শহরের প্রাচীন আল-শারীফ দুর্গের ছবি। সৌদিরা তিনগুণের বেশি আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে।
ফাটিক আল-রোদাইনি (@Fatikr)। মে ২৮, ২০১৫

রক প্যালেস হিসেবে পরিচিত ডার-আল-হাজরের অবস্থান সানার উত্তরাঞ্চলে। ১৭৮৬ সালে ইমাম মনসুর এটা প্রতিষ্ঠা করেন। সৌদিরা এটির ওপর বারংবার হামলা চালিয়েছে।

সৌদি বিমান আজ ডার-আল-হাজরের ওপর হামলা চালিয়েছে। দেশের ঐহিত্য এবং ইতিহাস সৌদি আগুনে পুড়ে যাচ্ছে।
ফাটিক আল-রোদাইনি (@Fatikr)। জুন ৪, ২০১৫

২৫ মে সৌদি হামলায় ধামার আঞ্চলিক জাদুঘর পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। এতে হিমিওরাইট সভ্যতার হাজার হাজার শিল্পকর্ম ধ্বংস হয়ে যায়।

ধামার জাদুঘরে হিমিওরাইট সভ্যতার ১০ হাজারের বেশি শিল্পকর্ম ছিল। এটার অবস্থান জাফর অঞ্চলের পাশে। সৌদি মিসাইল সেটা ধ্বংস করে দিয়েছে।

সৌদি নেতৃত্বাধীন মিত্র বাহিনীর হামলার আগে, পরে ধামার জাদুঘরের অবস্থা।

ইয়েমেনে প্রাচীন স্থাপনাগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল মারেব বাঁধ। এটি প্রাচীন বিশ্বের বিস্ময়কর ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের নিদর্শন, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় রাণী শেবা’র শাসনকালকে। গত জুন মাসের এক তারিখে সৌদি বিমান হামলায় এটি ধ্বংস হয়ে যায়। বাঁধটি প্রথম নির্মিত হয় খ্রীষ্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দীতে, মারিব শহরে। শহরটি রাণী শেবা’র রাজধানী ছিল।

বিমান হামলায় রাণী শেবা’র শহরের ‘ইঞ্জিনিয়ারিং মার্বেল’ হিসেবে পরিচিত মারেব বাঁধ ধ্বংস হয়ে গেছে।

ইয়েমেন পোস্ট নিউজপেপার বিখ্যাত এই বাঁধ ধ্বংসের আগে ও পরের ছবি শেয়ার করেছে:

আগে ও পরে: ইয়েমেনের পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ঐতিহাসিক “মারেব বাঁধ”-এর ছবি। এটার ওপর সৌদি বিমান হামলা হয়েছে।

তায়েজ শহরের আল-কাহেরা দুর্গটি ছিল দেখার মতো। সেখানে দাঁড়িয়ে শহরের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখা যেত। ৫ জুন সৌদি বিমান হামলায় সেটাও ধ্বংস হয়ে যায়। হুতি বাহিনী এবং ক্ষমতাচ্যুত রাষ্ট্রপতি আলী আবদুল্লাহ সালেহ দুর্গটিকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতেন। এখান থেকেই তারা শহরে অবস্থানকারী প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর গোলা নিক্ষেপ করতেন।

ইয়েমেন পোস্ট নিউজপেপার দুর্গটি ধ্বংস হওয়ার আগে ও পরের ছবি পোস্ট করেছে। ছবিতে ফুটে উঠেছে সৌদি হামলায় দুর্গটির কী হাল হয়েছে।

আল-কাহেরা দুর্গ ধ্বংস: ইয়েমেনের অন্যতম ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং জাতিসংঘ ঘোষিত হেরিটেজ সাইটে সৌদি বিমান হামলা করেছে।

হামলার আগে ও পরে:
৮০০ বছরের পুরোনো আল-কাহেরা দুর্গ। নাহ্, সৌদি মিসাইলকে আর ধন্যবাদ জানাতে পারছি না।

সৌদি হামলায় ইয়েমেনজুড়ে যে ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস হচ্ছে তা ১২ জুনের সকালের আগ পর্যন্ত বিশ্ববাসী কেউই জানতোই না। ওইদিন সকালে পুরোনো সানায় ইউনেস্কোর তালিকাভুর্ক্ত স্থাপনায় সৌদি মিসাইল আঘাত হানে। এতে ৯ হাজার মাটির ঘর ধ্বংস হয়। এগুলো ১১ শতকের পূর্বে নির্মিত হয়েছিল। সৌদি বিমান হামলায় ৩ হাজার বছরের পুরোনো ঐতিহ্যগুলো ধ্বংস হওয়ার খবরে বিশ্ববাসী ক্ষোভ প্রকাশ করে। তাছাড়া বেশিরভাগ ইয়েমেনি তাদের গর্বের স্থাপনাগুলো ধ্বংস হওয়ায় বিচলিত বোধ করেন।

ইউনেস্কো একটি ভিডিও আপলোড করেছে, যেখানে পুরোনো সানা’র ঐতিহ্যগুলো উঠে এসেছে:

চিত্রগ্রাহক অ্যালেক্স পোট্টার মন্তব্য করেছেন:

শুধু ধুলি আর ধুলি! #সানা #ইয়েমেন

সিএনএন-এর মধ্য রাতের খবরে উঠে এলো পুরোনো সানা’র ধ্বংসচিত্র।

পুরোনো সানা’য় হামলার ঘটনায় ইউনেস্কোর মহাসচিব আবারো নিন্দা করেছেন। তিনি তার বিবৃতিতে বলেছেন:

I reiterate my call to all parties to respect and protect cultural heritage in Yemen. This heritage bears the soul of the Yemeni people, it is a symbol of a millennial history of knowledge and it belongs to all humankind.

আমি সবাইকে আবারো অনুরোধ করছি ইয়েমেনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যগুলো রক্ষা করতে। এই ঐতিহ্যগুলো ইয়েমেনের মানুষজনের আত্মাকে বহন করে। এগুলো হাজার হাজার বছরের মানুষের অর্জিত জ্ঞানের প্রতীক। এগুলো শুধু ইয়েমেনিদের নয়, পৃথিবীর সকল মানুষের সম্পদ।

সৌদি মিসাইল আক্রমণের আগে ও পরে পুরোনো সানা’র কাসেমী এলাকার ছবি শেয়ার করেছেন। ছবিতে মিসাইল হামলায় মাটির বাড়িগুলোর যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা উঠে এসেছে।

পুরোনো সানা শহর।
বিমান আক্রমণের আগে ও পরে।

আল-আরাবি আল-জাদিদ পত্রিকায় আবুবকর আল-শামাহি একটি লেখা লিখেছেন। সেখানে বেশিরভাগ ইয়েমেনির মনোভাব উঠে এসেছে:

We have become accustomed to seeing the destruction of Yemen.
Yet, when the places destroyed are buildings you remember, streets you walked down and sights you loved, the pill is harder to swallow…Of course, the lives of the thousands killed in Yemen's war are more important. But I, and many other Yemenis, feel a deep sense of pain when we see the destruction of our heritage, places that we want to share with the world.

It took our ancestors hundreds, if not thousands of years to build our cities in the sands and our palaces in the mountains. All it takes is a moment for them to be destroyed.

আমরা ইয়েমেনের ধ্বংস দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। আপনি যেসব স্থাপত্যের কথা মনে করতে পারেন, যেসব রাস্তায় হেঁটে বেড়িয়েছেন, যেসব জায়গা আপনি পছন্দ করতেন, মেনে নিতে কষ্ট হলেও সেগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে। হাজার হাজার ইয়েমেনি যারা যুদ্ধে মারা গেছেন, অবশ্যই তারা খুব গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমি এবং আমার মতো অসংখ্য ইয়েমেনি আমাদের ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা এবং স্থান ধ্বংসে খুব কষ্ট পেয়েছি। আমরা বিশ্ববাসীর সাথে তা শেয়ার করতে চাই।

এইসব তৈরি করতে আমাদের পূর্বপুরুষদের শত বছর নয়, হাজার হাজার বছর লেগেছে। আর সেগুলো ধ্বংস করতে মুহূর্ত মাত্র সময় লেগেছে।

আলী আলমুরতাদা একটি তুলনা দিয়ে ইয়েমেনিদের বেদনার ব্যাখ্যা দিয়েছেন:

পিরামিড যেমন মিশরের প্রতিনিধি, তেমনি পুরোনো সানাও ইয়েমেনের প্রতিনিধিত্ব করে। চিন্তা করুন মিশরের পিরামিড ধ্বংস হলে কেমন লাগবে।

অর্থনৈতিকভাবে ইয়েমেন দরিদ্র দেশ হলেও সাংস্কৃতিকভাবে বেশ সমৃদ্ধ। হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য ইয়েমেনিদের গর্বেব উত্স। তাই এর ধ্বংসচিত্র প্রত্যক্ষ করা যেকোনো ইয়েমেনির জন্য বেদনাদায়ক। তাই সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনীর “অপারেশন রিস্টোরিং হোপ” আজ “অপারেশন ডিস্ট্রয় হিস্টরি” হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ, ইতিহাস, ঐতিহ্য’র জন্য ইয়েমেনিরা আজ কাঁদছে।

আলোচনা শুরু করুন

লেখকেরা, অনুগ্রহ করে লগ ইন »

নীতিমালা

  • অনুগ্রহ করে অপরের মন্তব্যকে শ্রদ্ধা করুন. যেসব মন্তব্যে গালাগালি, ঘৃণা, অবিবেচনা প্রসূত ব্যক্তিগত আক্রমণ থাকবে সেগুলো প্রকাশের অনুমতি দেয়া হবে না .