বন্ধ করুন

আমাদের স্বেচ্ছাসেবক সম্প্রদায় কাজ করে যাচ্ছে বিশ্বের কোনা থেকে না বলা গল্পগুলো আপনাদের কাছে তুলে ধরতে। তবে আপনাদের সাহায্য ছাড়া আমরা তা পারব না। আমাদের সম্পাদনা, প্রযুক্তি এবং প্রচারণা দলগুলোকে সুষ্ঠুভাবে চলতে সহায়তার জন্যে আপনারা আপনাদের দানের অংশ থেকে কিছু গ্লোবাল ভয়েসেসকে দিতে পারেন।

সাহায্য করুন

উপরের ভাষাগুলো দেখছেন? আমরা গ্লোবাল ভয়েসেস এর গল্পগুলো অনুবাদ করেছি অনেক ভাষায় যাতে বিশ্বজুড়ে মানুষ এগুলো সহজে পড়তে পারে।

আরও জানুন লিঙ্গুয়া অনুবাদ  »

বাংলাদেশে পাচারকারী সন্দেহে ৪ স্বেচ্ছাসেবীকে গ্রেফতার করায় সর্বত্র ক্ষোভ

একজন পথশিশু আবর্জনার স্তুপে খেলা করছে। ছবি তুলেছেন এমডি মানিক। স্বত্ব: ডেমোটিক্স (২৩.০১.২০১৪)।

একজন পথশিশু আবর্জনার স্তুপে খেলা করছে। ছবি তুলেছেন এমডি মানিক। স্বত্ব: ডেমোটিক্স (২৩.০১.২০১৪)।

গত ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৫, শনিবার বাংলাদেশের পুলিশ ঢাকার রামপুরায় একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে ১০ জন শিশুকে উদ্ধার করে, যাদের বয়স ৯-১৪ বছর। তারা সেখানে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের তত্ত্বাবধানে ছিল। সংগঠনটি পথশিশুদের নিয়ে কাজ করতো। অভিযানের সময় পুলিশ অদম্য বাংলাদেশ নামে পরিচিত ওই সংগঠনের ৪ কর্মীকেও আটক করে। এরা হলেন আরিফুর রহমান, জাকিয়া সুলতানা, হাসিবুল হাসান সবুজ এবং ফিরোজ আলম শুভ। পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে মানব পাচারের অভিযোগ এনেছে।

পুলিশ জানিয়েছে,মোবারক নামের এক শিশুর চাচার অভিযোগের প্রেক্ষিতে অভিযান পরিচালনা চালিয়ে তাদের আটক করে।মোবারককে তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। উদ্ধারকৃত বাকি শিশুদের বাবা-মা’র হদিস না পাওয়ায় তাদেরকে কিশোর অপরাধ সংশোধনাগারে পাঠানো হয়েছে

একুশে টেলিভিশন টুইট করে:

স্বেচ্ছাসেবীদের আটকের ঘটনায় দেশজুড়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। তাছাড়া তদন্তের আগেই তাদের মানব পাচারকারী হিসেবে উল্লেখ করায় অনেকের পুলিশের সমালোচনা করেন।

বাংলাদেশে পথশিশুর সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ

৪ বাংলাদেশী তরুণ শিক্ষার্থী অদম্য বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন গড়ে তোলেন। এরা হলেন আরিফুর রহমান, জাকিয়া সুলতানা, হাসিবুল হাসান সবুজ এবং ফিরোজ আলম খান শুভ। সংগঠনটি পথশিশুদের পড়াশোনার পাশাপাশি কম্পিউটার শিক্ষা দিয়ে থাকে, যাতে ভবিষ্যতে তারা নিজেদের স্বাবলম্বী করে তুলতে পারে।

বাংলাদেশে পথশিশুদের সংখ্যা কত সে বিষয়ে সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে কোনো কোনো সংগঠনের মতে, বর্তমানে এই সংখ্যা ১২ লাখ। এদের বেশিরভাগই বাস করে রাজধানী ঢাকায়। এদের দু’বেলা খাবার জোটে না। নোংরা পরিবেশ আর অপুষ্টিতে বেড়ে ওঠা এসব শিশু খুবই মানবেতর অবস্থায় জীবনযাপন করে। [গ্লোবাল ভয়েসেস-এর প্রতিবেদন]।

অদম্য বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন যেসব শিশুদের আশ্রয় দিয়েছে, তাদের বেশিরভাগই পথশিশু। তাদের বাবা-মা নেই। এখানে আসার আগে কেউ রাস্তার ময়লা কুড়াতো, কেউ কমলাপুর রেলস্টেশনে রাত কাটাতো। কেউ কেউ সৎ মায়ের অত্যাচারে বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছিল। কেউ কেউ এসেছিল বাড়িতে নির্যাতনের শিকার হয়ে। আবার কেউ ঢাকায় ঘুরতে এসে আর বাড়ি ফিরে যায়নি।

এদিকে উদ্ধারকৃত শিশুরা সংগঠনটির তত্ত্বাবধানে ভালো ছিল বলে পুলিশকে জানিয়েছে।

‘পকেটের টাকা দিয়ে তাদের খাবার কিনে দিতাম’

পথশিশুদের জন্য সংগঠনটি দু’টি স্কুল পরিচালনা করতো। একটির নাম মজার ইশকুল। তানভীর আহম্মেদ সংগঠনটির মজার ইশকুল কার্যক্রমে স্বেচ্ছাসেবীর কাজ করেন। তিনি ফেসবুকে লিখেছেন:

তিনটা বছর ধরে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রোদ বৃষ্টি হরতাল অবরোধ সব কিছুর বাঁধা তোয়াক্কা করে ছুটে গেছি রাস্তার পাশে থাকা পার্কের বেঞ্চে রাত কাটালো বাচ্চাগুলোর কাছে ওদের একটু লেখাপড়া একবেলা ভালো খাবার খাওয়ানো। এই সব কিছু করা কি আমাদের দোষ ছিলো এটার জন্য আমাকে তো কোন টাকা দেওয়া হতো না বরং ওদের কে খাওয়ানোর জন্য নিজের পকেটের টাকা খরচ করতাম আর আজকে আমরা হলাম পাচারকারী।

অমি রহমান পিয়াল লিখেছেন:

[…] তরুণ বয়সে অনেক রোমান্টিসিজম থাকে মানুষের, সমাজ বদলের স্বপ্ন এই সময়টাতেই দেখে মানুষ। আরিফ, সবুজ, জাকিয়া শুভরাও সেই স্বপ্ন নিয়েই কাজ করছিলো পথ শিশুদের নিয়ে। এরপর যা ঘটলো সেটা তারা হয়তো দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করেনি। রামপুরা থানা পুলিশ এই চার তরুণ তরুণীকে গ্রেফতার করেছে মানবপাচারকারী হিসেবে, পথ থেকে কুড়িয়ে এনে যাদের মানুষ বানানোর দায়িত্ব নিয়েছিলো তাদের দেখিয়েছে উদ্ধার হিসেবে।

গতবছর সংগঠনটি একটি অভিজাত রেস্টুরেন্টে পথশিশুদের জন্য বিশেষ খাবারের আয়োজন করে। লেখক আশীফ এন্তাজ রবি এই কার্যক্রমের সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি ফেসবুকে লিখেছেন:

আমরা গত বছর স্টার কাবারে ৩৬৫ জন বাচ্চাকে ভরপেট মাংস পোলাও খাইয়েছিলাম। যে বাচ্চারা স্টার কাবাবের সামনে দাঁড়িয়ে এক টুকরো হাড্ডি ভিক্ষা চাইতো, তারা গিয়ে বসেছিলো শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত টেবিলে। বেয়ারারা এসে বিনয়ের সাথে বলেছে, স্যার কি খাবেন?
তারপর তাদের পছন্দ মতো খাবার, পানীয় দেয়া হয়েছে।
খাবারের ফাঁকে ফাঁকে ছিলো সিসিমপুরের কার্টুন প্রদর্শনী।

[…]এই আয়োজনের দুই নিবেদিতপ্রাণ এবং মূল কর্মী, যারা সারাজীবন বাচ্চাদের নিয়ে কাজ করেছে আরিফ আরিয়ান আর জাকিয়া পুলিশী রিমান্ডে। তারা নাকি শিশু পাচারকারী। এই দুঃখ আমি কোথায় রাখবো?

আরিয়ান আরিফ। অদম্য বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা। ছবিটি ইভেন্ট পেইজ থেকে নেয়া হয়েছে।

আরিয়ান আরিফ। অদম্য বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা। ছবিটি ইভেন্ট পেইজ থেকে নেয়া হয়েছে।

সংগঠনটি পথশিশুদের শিক্ষা দেয়ার জন্য একটি স্কুল পরিচালনা করতো। এটির নাম মজার স্কুল। আরিফ আর হোসাইন মজার স্কুল প্রতিষ্ঠার প্রথম দিকের কথা উল্লেখ করে লিখেছেন:

অনেক স্বপ্ন আছে এদের… একটা বাস বানানো হবে মজার ইশকুল নামে

কনসেপ্টটাও মজার; যে সকল সুবিধাবঞ্চিত বাচ্চারা স্কুলে যেতে পারে না … স্কুল তাদের কাছে যাবে

এক একদিন একএকটা এলাকার বস্তির সামনে যেয়ে এই বাস থামবে

বাসের ভিতরে কোন সিট থাকবে না… থাকবে মাদুর বিছানো…

সবাই মাদুরে বসে প্রোজেক্টরে কার্টুন দেখবে… পড়াশোনা করবে… ধাক্কাধাক্কি করবে… হৈচৈ করবে

… এই ছেলেসহ মজার স্কুলের ৪ জনকে ৩ দিন আগে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়

অপরাধ প্রমাণের আগেই দোষী?

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ফেসবুক পেইজে সংগঠনটির কর্মীদের মানবপাচারকারী হিসেবে উল্লেখ করে পোস্ট দেয়ার সমালোচনা করেছেন ব্লগার হাসান মোরশেদ:

কয়েকজন তরুন তরুনী ছিন্নমুল পথশিশুদের রাস্তা থেকে তুলে এনে আশ্রয়, খাদ্য ও শিক্ষার ব্যবস্থা করছিলো। শিশু পাচারকারী বানিয়ে তাদের গ্রেপ্তার ও রিমান্ড দেয়া হয়েছে। পুলিশের ফেসবুক পেজে তাদের ছবি ও পোষ্ট হয়ে গেছে। আদালত কর্তৃক অপরাধ প্রমানিত হবার আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে প্রচার করাটা আইনসম্মত কিনা সেই প্রশ্ন আর উত্থাপন নাইবা করলাম।

সমাজকর্মীদের গ্রেফতার ও তাদের রিমান্ডে নেয়ার সমালোচনার প্রেক্ষিতে ঢাকা মেট্রোপলিটান পুলিশের ফেসবুক পেইজে বলা হয়েছে:

আমি শুধু বুঝে পাচ্ছিনা আপনাদের সম্পূর্ণ ক্ষোভ যেয়ে পুলিশের উপর বর্তাচ্ছে কেন? এক বাচ্চার চাচা এসে অভিযোগ করলো তার ভাতিজা কে পাওয়া যাচ্ছেনা! আনুষ্ঠানিক একটি এজাহার দায়ের হয়েছে বুঝতে পেরেছেন?! আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আসলে পুলিশকে তার তদন্ত কার্যক্রম চালাতেই হবে এটিই আইনি বাধ্যবাধকতা !! এর বাইরে যাওয়ার পুলিশের উপায় নেই !

পুলিশের পেইজ থেকে সমালোচনা না করে তাদের সেবামূলক কর্মকাণ্ডের প্রমাণ হাজির করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে:

আপ্নারা যা করতে পারেন তাদের ভাল কাজের প্রমাণাদি সহ একটি ফাইল তৈরি করে আমাদের কাছে নিয়ে আসুন, আমি সেটি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে পৌঁছে দেব !! আশা করছি এটি তাদের কিছুটা হলেও সাহায্য করবে !!

পুলিশের বক্তব্যের পরপরই সামহোয়ারইনে ব্লগার আব্দুল্যাহ একটি ছবিব্লগ পোস্ট করেন। সেখানে সংগঠনটির কার্যক্রমের চিত্র উঠে আসে।

সাংবাদিক প্রবীর বিধান তার ফেসবুকে লিখেন:

ভুল তথ্য নিয়ে কাজ করলে #পুলিশ ভুল করতেই পারে। স্বীকার করতে দোষ কি? আরিয়ান আরিফসহ অদম্য বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের চারজনকে ছেড়ে দিন ও ভুল স্বীকার করে নিন।

এদিকে তাদের মুক্তির দাবিতে ফেসবুকে একটি ইভেন্ট পেইজ খোলা হয়েছে। সেখানে ইতোমধ্যে ৭ হাজারের বেশি ফেসবুক ব্যবহারকারী যোগ দিয়েছেন।

ফটো সৌজন্যে ওয়াসিয়া জান্নাত।

ফটো সৌজন্যে ওয়াসিয়া জান্নাত।

পেইজটিতে কিছু আপডেট তুলে ধরা হয়েছে:

সকালে ঢাকার প্রেসক্লাবে প্রায় সাতটি আটটি সমাজসেবক সংগঠনের উপস্থিতিতে একটি শান্তিপূর্ণ মানব বন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এরপর পরই চট্টগ্রামেও ‘অদম্য বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন’ এর চার স্বেচ্ছাসেবীর নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে মানব বন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে

‪#‎ডিএমপি‬র ফেসবুক পেইজ থেকে বহুল আলোচিত সেই পোস্টটি সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

‪#‎কেন্দ্রীয়_কারাগারে‬ চারজনের সাথে দেখা করা হয়েছে। জাকিয়া আপু ভালো নেই। প্রায় না খেয়ে আছে বলা যায়।

আলোচনা শুরু করুন

লেখকেরা, অনুগ্রহ করে লগ ইন »

নীতিমালা

  • অনুগ্রহ করে অপরের মন্তব্যকে শ্রদ্ধা করুন. যেসব মন্তব্যে গালাগালি, ঘৃণা, অবিবেচনা প্রসূত ব্যক্তিগত আক্রমণ থাকবে সেগুলো প্রকাশের অনুমতি দেয়া হবে না .