বন্ধ করুন

আমাদের স্বেচ্ছাসেবক সম্প্রদায় কাজ করে যাচ্ছে বিশ্বের কোনা থেকে না বলা গল্পগুলো আপনাদের কাছে তুলে ধরতে। তবে আপনাদের সাহায্য ছাড়া আমরা তা পারব না। আমাদের সম্পাদনা, প্রযুক্তি এবং প্রচারণা দলগুলোকে সুষ্ঠুভাবে চলতে সহায়তার জন্যে আপনারা আপনাদের দানের অংশ থেকে কিছু গ্লোবাল ভয়েসেসকে দিতে পারেন।

সাহায্য করুন

উপরের ভাষাগুলো দেখছেন? আমরা গ্লোবাল ভয়েসেস এর গল্পগুলো অনুবাদ করেছি অনেক ভাষায় যাতে বিশ্বজুড়ে মানুষ এগুলো সহজে পড়তে পারে।

আরও জানুন লিঙ্গুয়া অনুবাদ  »

পাকিস্তান: সালমান তাসিরের বেদনায়দায়ক হত্যাকাণ্ড এবং ব্লাসফেমি আইন

পাকিস্তানের জটিল রাজনীতির একটি বেদনাদায়ক অধ্যায় হচ্ছে পাঞ্জাব প্রদেশের গভর্নর জনাব সালমান তাসিরের হত্যাকাণ্ড। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের এক মার্কেটের খাবারের এলাকা ত্যাগ করার সময় তার নিজ দেহরক্ষী ঠান্ডা মাথায় তাকে হত্যা করে।

পাঞ্জাবের গর্ভনর সালমান তাসির। ছবি ফ্লিকার ব্যবহারকারী সালমান তাসিরের: সিসি বাই এনসি-এসএ

জনাব তাসির এক আলাদা বৈশিষ্ট্যের রাজনীতিবীদ, কঠোর মনোভাব সম্পন্ন, সাহসী এবং সময়ে রসিক ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পাঞ্জাবের নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকার পাকিস্তান মুসলিম লীগের (পিএমএল- নাওয়াজ শরীফ)-এর সাথে তার অস্বস্তিকর সম্পর্কের কারণেও তিনি পরিচিত ছিলেন। তিনি সেই সমস্ত বিষয় নিয়ে কথা বলতেন, যে সব বিষয় নিয়ে কেউ কথা বলতে সাহস করত না। ব্লাসফেমি আইন ছিল এর মধ্যে এক অন্যতম বিষয়।

গ্রেফতার হওয়া দেহরক্ষী মালিক মুমতাজ হাসান কাদরি। ছবি সাজ্জাদ আলি কোরেশির। কপিরাইট ডেমোটিক্স।

গভর্নরের দেহরক্ষী, যে কিনা পাকিস্তানের বিশেষ পুলিশ বাহিনীর সদস্য এবং নিজেকে ধরা দিয়েছেন, তার দাবী, সে এই কাজটি করেছে, কারণ সে মনে করেছে যে গর্ভনর অতি আলোচিত ব্লাসফেমি আইন নিয়ে নিন্দাসূচক মন্তব্য করেছে।

চুপ-চেঞ্জিং আপ পাকিস্তান-এর কালসুম, এই বাক্যে তার অনুভুতি প্রকাশ করে:

পাকিস্তান আজ তার এক সাহসী সন্তানকে হারালো।

গভর্নর সামজিক প্রচার মাধ্যম সমূহ যেমন, টুইটার এবং ফ্লিকারের এক সক্রিয় ব্যবহারকারী ছিলেন এবং পাকিস্তানের ব্লগোস্ফিয়ারের কয়েকজন তাকে সমর্থন করত। ইতোমধ্যে এই বিষয়টি নিয়ে এক গুঞ্জন তৈরি হয়েছে, মূলত ব্লাসফেমি আইন বাতিল করা বা এই আইনটির সংশোধন করার ইচ্ছার কারণে তার প্রতি এই সমর্থন প্রকাশ করা হয়েছিল। ব্লাসফেমি আইন সম্বন্ধে তার একটি টুইটের উদ্ধৃতি নীচে প্রদান করা হল।

“ব্লাসফেমি আইনের কারণে আমি প্রবল এক চাপের মুখে রয়েছি। নিঃসন্দেহে সর্বোচ্চ চাপের ক্ষেত্রেও আমি পিছে হঠে যাব না, এমনকি যদি এর বিরুদ্ধে লড়াই করতে থাকা শেষ ব্যক্তিটি আমি হই” [তার টুইটার একাউন্টটি এখানে দেখতে পাবেন যাবে]।

কালসুম নামক ভদ্রমহিলা তার পোস্টে যোগ করেছে:

আসিয়া বিবি নামক প্রথম এক খ্রিস্টান মহিলাকে ব্লাসফেমি আইনের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করার ঘটনার পর তাসির ব্লাসফেমি আইনের বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠে তার প্রতিবাদ জানাতে থাকেন। বেশ কিছু নাগরিক অধিকার কর্মী, সমালোচক এবং সরকারের কিছু কর্মকর্তার সাথে যুক্ত হয়ে তিনি সরকারকে সংবিধানিক ভাবে তা বাতিল করার বা সংশোধন করার দাবী জানিয়েছিলেন। ধর্মীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেবার মত সাহস প্রদর্শন করার কারণে দেশে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রদর্শন শুরু হয় এবং নিউইয়র্ক টাইমস নামক পত্রিকা সংবাদ প্রদান করেছে যে, গত শুক্রবার পাঞ্জাবের গভর্নরের কুশপুত্তলিকা দাহ করে হয়েছিল।

২০/১১/২০১০- তারিখে পাঞ্জাবের গভর্নর সালমান তাসির ব্লাসফেমি আইনে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত খ্রিস্টান মহিলা আসিয়া বিবিকে দেখতে যান। ছবি ফ্লিকার ব্যবহারকারী সালমান তাসির। সিসি বাই এনসি-এসএ

অনেকে মনে করেন যে গর্ভনর আসিয়া বিবির ঘটনায় বাড়াবাড়ি করেছেন। আসিয়া বিবি বর্তমানে ব্লাসফেমির অভিযোগ বিচারাধীন এবং এ কারণে তিনি কঠোর বাক্য ব্যবহার করেছেন এবং তীব্র ভাষায় নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তার মন্তব্য ব্লাসফেমি নামক আইনের প্রতি যথেষ্ট মনোযোগ প্রদান করেছিল। যারা ক্ষমতাশালী ব্যক্তি, অন্যদের রাজনীতির হাতিয়ার বানায়, তাদের কেউ কেউ এই সুযোগটি গ্রহণ করে।

ফারহান জানজুয়া, একজন পাকিস্তানী ব্লগার, তার টুইটার বার্তায় সে মন্তব্য করেছে:

“মুমতাজ কাদেরী (গর্ভনরের যে দেহরক্ষী তাকে গুলি করেছে) সে তার পেশার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে এবং তাকে কখনো “আশেকে-রাসুল” বলা (রাসুল হজরত মোহাম্মদকে [সঃ] যারা প্রচণ্ড ভালোবাসে) উচিত নয়, তাকে কখনোই ক্ষমা করা উচিত নয়”।

আরসালান মীর পাকিস্তানের এক টেলিকম ব্লগার। সে সঠিক ভাবে বিষয়টিকে উপস্থাপন করেছে।

“ এটা কখনোই কেবল ব্লাসফেমি আইনের বিষয় ছিল না। এটা হচ্ছে অতীতে এবং বর্তমানে সঠিক ভাবে এই আইনটিকে প্রয়োগের বিষয় #পাকিস্তান”।

টুইটার এক বেদনায় মূহ্যমান ছিল, যখন “সালমান তাহির” সারা বিশ্বে অন্যতম এক ধারায় পরিণত হয়। পাকিস্তানের টুইটার ব্যবহারকারী এবং ব্লগাররা প্রায় অভিন্ন স্বরে এই কাপুরোষোচিত কাজের প্রতি জোরালো ভাষায় ঘৃণা প্রকাশ করেছে এবং নিন্দা জানিয়েছে।

ওসামা বিন জাভিদ নামক ব্লগার সালমান তাসিরের হত্যাকাণ্ডের জন্য প্রচার মাধ্যমকে দায়ী করেছে:

সালমান তাসির খুন, শক্তিশালী ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা এবং ঘৃণার কারণে ঘটেছে; যা প্রচার মাধ্যম উসকে দিয়েছে। সমালোচকদের প্রতি আমার যুক্তি যে উরস উৎসব উদযাপন অথবা ধর্মীয় গোষ্ঠীর সহিংস প্রতিবাদকে প্রচার মাধ্যম বৈষম্যহীনভাবে যথেষ্ট পরিমাণ গুরুত্ব দিয়েছে।

যখন অনেকে একে এক ব্যক্তির কাজ হিসেবে দেখছে, সেখানে ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে একেবারে উপেক্ষা করা যায় না এই বাস্তবতায় যে, পাকিস্তানের ইতিহাসে রাজনীতির নির্মম শিকার এবং রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের অজস্র উদাহরণ রয়েছে। এই ঘটনা যে সময় ঘটল, সে সময় শাসক দল পিপিপি সংসদে তার সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে, নিঃসন্দেহে তা পাকিস্তানে এক ভ্রু-কুঞ্চনের জন্ম দিয়েছে।

আসুন আমরা বিষয়টির মুখোমুখি হই, পাকিস্তানে ব্লাসফেমি আইনের পরিবর্তন ঘটানো এক কঠিন কাজ। এটি এমন একটি বিষয়, যা পাকিস্তানের জনতার জন্য সংবেদনশীল উপাদান। এখানে মুক্ত এবং খোলা মনে বিষয়টি বোঝা কি ভাবে এই আইনটির অপব্যহার হচ্ছে তার অভাব রয়েছে, কাজেই বিষয়টি রাজনীতিবিদদের ইচ্ছার উপর নির্ভর করছে যে, এ ক্ষেত্রে তারা আইনের ইতিবাচক এক ধারণা প্রদান করবে এবং এই বিষয়ে এক গ্রহণযোগ্য পরিবর্তন আনবে।

হুমা ইমতিয়াজ লিখেছেন:

আবার আমি এ কথাটি উচ্চারণ করছি: ব্লাসফেমি আইন আজ যে রুপে এবং আকারে অবস্থান করছে, তাতে এটি কাউকে খুন করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। ২০ বছর ধরে এই আইন মানুষ হত্যার কারণ হয়ে আসছে। এই আইনের মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, এই প্রেক্ষাপটে বলা যায়, ব্লাসফেমি ইসলাম ধর্মের কোন বিষয় নয়, এটা ইহুদি ধর্ম এবং খ্রিস্টান ধর্মে শাস্তি প্রদানের জন্য ব্যবহার করা হয়, কিন্তু পাকিস্তানে কিভাবে এই আইনের প্রয়োগ হচ্ছে তা মূল বিষয়।

দুঃখজনকভাবে, আজকে আমরা যা দেখতে পাচ্ছি, তা হচ্ছে এর মাধ্যমে ঠাণ্ডা মাথায় কাউকে খুন করা হচ্ছে, যাকে কোন ভাবেই ন্যায়সঙ্গত কাজ বলা যাবে না, বিশ্বের কোন ভাবনায় বা কোন ধর্মের মাধ্যমে তা হওয়া উচিত নয়। এই ঘটনা পাকিস্তানে সমাজে ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতার প্রতিফলিত ঘটাচ্ছে এবং অযোগ্য মোল্লাদের শঙ্কাজনক প্রভাব বিস্তারের ঘটনাকে তুলে ধরছে, যারা অপরিণত এবং দুর্বল মানসিকতার চর্চা করছে।

এই ঘটনার পরিপেক্ষিতে পাকিস্তানে এমন এক তদন্ত কার্য শুরু হবে যা কখনো শেষ হবে না এবং তা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে, যেমনটা যে কোন ঘটনার সময় ঘটে থাকে। আমরা কেবল আশা করতে পারি এই বার ন্যায়বিচারের জয় হবে এবং চৈতন্যের বিকাশ ঘটবে। অন্যদিকে বর্তমান পাকিস্তান সরকার, তার মেয়াদকালের প্রায় শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছেছে। সন্ত্রাসবাদ এবং দেশের মধ্যে জন্ম নেওয়া উগ্রবাদকে কঠোর হস্তে দমন করতে হবে।

তারিখ নামার শাহিদ এই বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে তার পোস্ট শেষ করেছে:

এক কাপুরুষ হিসেবে, আমি কেবল তার জন্য ব্লগ লিখতে পারি। এর জন্য যা প্রাপ্য, আসুন আমরা সেই বিষয়টি উদযাপন করি, যার জন্য তিনি উঠে দাঁড়িয়ে ছিলেন, এবং এই রকম কাপুরুষোচিতভাবে তাকে হত্যার দায়দায়িত্ব কেবল একজন মানুষের উপর নয়, একটি জাতীর উপর বর্তায়।

1 টি মন্তব্য

আলোচনায় যোগ দিন

লেখকেরা, অনুগ্রহ করে লগ ইন »

নীতিমালা

  • অনুগ্রহ করে অপরের মন্তব্যকে শ্রদ্ধা করুন. যেসব মন্তব্যে গালাগালি, ঘৃণা, অবিবেচনা প্রসূত ব্যক্তিগত আক্রমণ থাকবে সেগুলো প্রকাশের অনুমতি দেয়া হবে না .