পুর্ব আর দক্ষিণ এশিয়া: কীটনাশক খেয়ে আত্মহত্যা স্বাভাবিক ঘটনা

Dangerসেপ্টেম্বরের ১০ তারিখে বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস এগিয়ে আসলেও, নতুন একটি গবেষণা দেখাচ্ছে যে এশিয়াতে কীটনাশক পানে প্রচুর আত্মহত্যা হয়ে থাকে। এই গবেষণা বিশ্বের বিভিন্ন আত্মহত্যার পদ্ধতিগুলো পর্যবেক্ষণ করে দেখছে যাতে এটা প্রতিরোধে কার্যকর উপায় বের করা যায়।

বিশ্বব্যাপী গড়ে প্রতিদিন ৩০০০ লোক আত্মহত্যা করে। কীটনাশক পান তার মধ্যে বহুল প্রচলিত একটি উপায়। হিসেবে দেখা গেছে যে বিশ্বে প্রতি বছর ৩ মিলিয়ন কীটনাশক বিষক্রিয়ার ঘটনা ঘটে, যার ফলে ২৫০,০০০ এর বেশী মৃত্যু হয়। এই নতুন গবেষণাসহ বিভিন্ন রিপোর্ট দেখিয়েছে যে এই সমস্যা গ্রাম্য এলাকায় প্রকট, বিশেষ করে এশিয়ার দেশসমুহে যেমন চীন, ভারত আর শ্রীলংকায়।

ভারতে, চাষাবাদের সংকট নিয়ে অনেক লেখা হয়েছে, যার ফলে অনেক কৃষক আত্মহত্যা করছে।

কেরেলা৮৮২১ তার ব্লগে কৃষকের অপ্রীতিকর অবস্থার কথা ব্যাখ্যা করেছেন:

“সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতে অনেক কৃষক আত্মহত্যার ঘটনা দেখেছে। আমরা অর্থনৈতিক বিষ্ফোরণের দুয়ারে থাকতে পারি, কিন্তু ভারতে ১৯৯৭ সাল থেকে ২৫,০০০ এর বেশী কৃষক নিজেকে মেরে ফেলেছে, বেশীরভাগ কীটনাশক পান করে। দেনা আর ঋণদাতার হাতে হেনস্থা হওয়া এর মূল কারন।

কৃষকরা দেনার দায়ে পড়ে গিয়েছিল উচ্চ কৃষি খরচ (অতিরিক্ত দামী তথাকথিত হাইব্রিড বীজ আর বহুজাতিক কোম্পানী দ্বারা বিক্রিত কীটনাশক) আর তাদের উৎপাদিত পণ্যের ভালো দামের অভাব। আমদানিও কিছুটা প্রভাব ফেলেছে আর অনাবৃষ্টি তাদের কষ্ট বাড়িয়েছে। এইসব কৃষকদের জন্য পানি ও সেচ এখনও ব্যয়বহুল আর স্থানীয় সরকার তাদের কোন সাহায্য করেনি।”

ভিনা সিথারামা আন্নাদানা একটি লেখায় বলেছেন যে আত্মহত্যার হার আসলে অনেক বেশী:

“বীজ, কীটনাশক আর সারের উচ্চ মূল্য কৃষকদের বাধ্য করেছে ঋণ নিতে, আর তাদের মধ্যে থেকে হাজারে হাজারে কৃষক যে কীটনাশক তাদের জন্য বোঝা হয়েছিল তাই খেয়ে আত্মহত্যা করেছে।

সরকারের স্বীকারোক্তি মতে, গত দশকে এক লাখের বেশী কৃষক আত্মহত্যা করেছে পশ্চিম মহারাষ্ট্র, মধ্য প্রদেশের কেন্দ্রভাগে, দক্ষিণ অন্ধ্র প্রদেশ আর কর্ণাটকে।”

কেসইন্ডিয়াট্রিপস ২ ব্লগে লিখেছেন বিয়াঙ্ক৭৯ তার এই ধারনা প্রসঙ্গে যে যারা আত্মহত্যার চেষ্টা করেন তাদের অনেকে হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না:

“আজ সকালে আমাদের শেষ আলোচনা ছিল ভারত আর আমেরিকার মধ্যে আত্মহত্যার উপায়ের তুলনা। আমাদের মেডিকাল ওয়ার্ড আর আইসিইউতে যা আসে তা হলো টাইলানোল, হতাশানাশক আর সাধারণ ঔষধ। কিন্তু সমাজে মনে হয় তার চেয়ে বেশী আছে কীটনাশক, সাজানের জন্যে বিষাক্ত বেরী ইত্যাদি উপায়। এটি কল্পনা করলে মাথা ঘুরে যায় যে কতোজন চেষ্টা করে, কিন্তু হাসপাতালে সেবার জন্য পৌঁছাতে পারে না, বা সেবা গ্রহণের সামর্থ নেই।”

ইন্ডিয়া ডেভেলাপমেন্ট ব্লগের সার্থক গৌরভ বলেছেন যে এইসব রাসায়নিক পন্যের সহজলভ্যতা এর জন্যে কিছুটা দায়ী:

“বিদর্ভের মতো এলাকা যেখানে ভারতের সব থেকে বেশী কীটনাশক পানের নজির আছে সেখানে সরকারের উচ্চহারে ভর্তুকি দেয়া কীটনাশক প্রচুর পাওয়া যায়। এই রকম পরিস্থিতিতে দুর্গত কৃষকদের কীটনাশক পানে আত্মহত্যার হার এখানে তাই বেশী হতে বাধ্য। আমেরিকায় বাস্তবতায় এই কীটনাশককে শট গানও বলা যায়!”

এই ছবিতে ভারতীয় কৃষকদের আত্মহত্যা সমস্যা তুলে ধরা হয়েছে।

চীনেও কীটনাশক আত্মহত্যার উপায় হিসেবে বহু ব্যবহৃত। একটি নিরীক্ষায় দেখা গেছে যে চীনের গ্রামাঞ্চলে ৬০% আত্মহত্যা এইভাবে হয়, আর একটি রিপোর্টে দেখা গেছে যে শুধুমাত্র চীনেই বছরে কীটনাশক পানে ১৭৫০০০টি মৃত্যু হয়, বেশীরভাগ কৃষিপ্রধান এলাকায়।

প্লিজ হেল্প বার্মা ব্লগের একটি লেখায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে চীনের আত্মহত্যার হার কিভাবে একটা ধারা প্রকাশ করেছে:

“চীন একমাত্র দেশ যেখানে পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের আত্মহত্যার মাত্রা বেশী। ৯০% এর মতো চীনা মহিলা যারা গ্রামের দিকে আত্মহত্যা করে তাদের কাছে বিষাক্ত কীটনাশক সহজলভ্য।”

চায়নাবাঊন্ডার তার বই থেকে অংশবিশেষ তুলে ধরেন, বলেছেন যে চীনে গ্রামীণ অঞ্চলে আত্মহত্যার মূল কারন দারিদ্র আর গৃহ নির্যাতন যা মহিলাদের সব থেকে বেশী আঘাত করে। তিনি লিখেছেন:

“এই সমস্যা স্বীকার করে কৃষি মন্ত্রণালয়ের একজন উপ পরিচালক লিউ ডেঙ্গাও বলেছেন যে তার মন্ত্রণালয় অতি বিষাক্ত কীটনাশক উৎপাদন সীমিত করবে, বীজের রঙ আর গন্ধ পরিবর্তন করবে, রাসায়নিক বস্তু অল্প পরিমানে প্যাকেট করবে, আর জনগণকে কীটনাশকের সঠিক ব্যবহার আর সংরক্ষণ বিষয়ে শিক্ষা দেবে।”

কিন্তু তিনি যোগ করেছেন:

“দোকানের বাইরে জীবননাশক কীটনাশক পাওয়া যায়, বাড়ীতে ঠিকমতো রাখা হয়না, আর ক্ষনিকের রাগ বা হতাশার কারনে এই কম মূল্যের প্রতিশোধের উপায় সহজে বেছে নেয়ার সুযোগ থাকে।”

উচ্চ আত্মহত্যার হারের কারনে দক্ষিণ কোরিয়া রক্ষণাত্মক ব্যবস্থা ঘোষণা করবে, যার মধ্যে কিছু কীটনাশকের সাথে সম্পর্কিত। ২০০৫ সালে ওইসিডি দেশেগুলোর মধ্যে দক্ষিন কোরিয়ার আত্মহত্যার হার সব থেকে বেশী ছিল

দক্ষিন কোরিয়ার উচ্চ হারের আত্মহত্যার কিছু কারন হানিঢাইন্স আলোচনা করেছেন:

“আত্মহত্যা করার কয়েকটি উপায়ের মধ্যে সাবওয়ে ট্রেনের নীচে ঝাঁপ দেয়া আর কীটনাশক পান করা উল্লেখযোগ্য…

… আমার গবেষণা অনুযায়ী দক্ষিণ কোরিয়ার আত্মহত্যা মৃত্যুর চতুর্থ সর্বোচ্চ কারন। এই হার পরিবর্তনশীল আর সংঘাতময় লিঙ্গের ভূমিকা, অর্থনৈতিক কষ্ট আর গৃহ নির্যাতনের প্রতিচ্ছবি। কিন্তু এটা মানসিক রোগ আর অন্যান্য সামাজিক কারন যা বিশেষভাবে এই পরিসংখ্যানে অবদান রাখে তাদের গুরুত্ব কমিয়ে দেয়।”

অ্যালেক্স শাডেনবার্গ তার ব্লগে কোরিয়ান সরকারের নতুন ব্যবস্থা সম্পর্কে বলেছেন:

“সরকার ১০টি জেলায় আত্মহত্যার হার কমানোর জন্য ব্যবস্থা চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সম্পূর্ণ পরিকল্পনা পরের সপ্তাহে ঘোষণা করা হবে। পদক্ষেপগুলোর মধ্যে থাকবে:

  • ট্রেন স্টেশনে প্লাটফর্মে থামার জায়গায় স্বচ্ছ বাউন্ডারী দিয়ে দরজা নির্মাণ।
  • কীটনাশক আর অন্যান্য বিষ বিক্রির ক্ষেত্রে কঠিন নিয়ম।
  • কল্যানভাতা বাড়ানো হবে।
  • যেসব ইন্টারনেট সাইট আত্মহত্যা উৎসাহিত করে সেগুলো ব্লক করা হবে।”
  • প্যাসিফিক থটসসাইমন হ্যাচার উল্লেখ করেছেন যে কিছু দরকারী পদক্ষেপ এখনো বাদ আছে:

    “আশ্চর্যজনক যে মানসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভুমিকা বা আত্মহত্যা প্রতিরোধে প্রাথমিক চিকিৎসার কথার উল্লেখ নেই। এই পরিকল্পনা বিশ্ব আত্মহত্যা দিবস সেপ্টেম্বর ১০ তারিখে ঘোষণা করা হবে- আশা করি অন্যান্য দেশ কিভাবে এটা করছে তারা তা দেখছে।”

    আলোচনা শুরু করুন

    লেখকেরা, অনুগ্রহ করে লগ ইন »

    নীতিমালা

    • অনুগ্রহ করে অপরের মন্তব্যকে শ্রদ্ধা করুন. যেসব মন্তব্যে গালাগালি, ঘৃণা, অবিবেচনা প্রসূত ব্যক্তিগত আক্রমণ থাকবে সেগুলো প্রকাশের অনুমতি দেয়া হবে না .